Saturday, 8 June 2013

জারিনা


কান্দি আমি দিনে রাতে
বনের পথে বাঁশি হাতে
পাগল আমায় বলে কয়জনা।।

জারিনা কে আমি জানি না। তবুও তার জন্য কাঁদতে হয়। প্রেসিডেন্সির বাংলা বিভাগের সবচেয়ে বড় ঘরটায় কোনও এক বৃষ্টি ধোয়া মেঘে ঢাকা দিনে গানটা প্রথম শুনেছিলাম। বড় বড় চুল আউল বাউল একটা ছেলে চোখ বুজে গাইছে। আর বেরোনো গেলও না। একটা অদ্ভুত মনকেমন করা সুর। আমাদের সেই তথাকথিত শিক্ষিত শহুরে সমাজের মার্জিত শিল্পিত মন কেমন নয়। অদ্ভুদ এক পাগল করা মন খারাপের সুর। দেবায়ন বলেছিল এটা উত্তর বঙ্গের এক অল্পচেনা লোক সংগীত। ওখানে নাকি জারিনার পালা বলে কোনও এক যাত্রা হয়। সেই খান থেকে গানটা পেয়েছে। শিউলিতলার আঙ্গিনাতে কোনও এক কিশোর প্রেমিক ভালবাসার প্রথম মালা পরিয়ে দিয়েছিল জারিনাকে। কিন্তু হায় রে অবুঝ কৈশোর! বেচারা জানত না, সব মালাই একদিন খুলে যায়। সব জারিনারাই চলে যায়।
জারিনা তুই আইজ কত দূর!!
শহর গিয়া হইলি নিঠুর
একবার ও তো ফিরা দেইখলি না।
তোর্সা নদী ওই বইয়া যায়
মইশাল বন্ধু ভাওয়াইয়া গায়
সেই ব্যাথা কি বুকে বাজল না??
সত্যি, আমাদের লোকসঙ্গীতে যে কত সহজ সুরের শয়তানি লুকিয়ে থাকে ! আমার বেসুর গলার পরদার ওপরে গান ওঠে না। কিন্তু এই গানের জন্য বড্ড মনকেমন।কবে যে আবার সিধু কিংবা দেবায়নের সাথে দেখা হবে!! বঙ্কিমের একটা উপন্যাসে পরেছিলাম, “ বুঝিবা অল্পবয়সের প্রেমে কিছু অভিশাপ আছে"। সেই অভিশাপ বুকে নিয়েই তোর্সাপারের কিশোর প্রেমিক বলে,
“ কম বয়সে প্রেম যে করে,
মরণ হয় তার প্রেমের তরে
সেই মরণের নাই যে তুলনা,রে জারিনা।"
এইসব গান ইন্টারনেট এ পাওয়া যায় না। ভাগ্যিস!! তাই তো আমার মনকেমনের অপেক্ষায় দেবায়নের রেওয়াজ না করা গলার স্বভাবসুর। এই গানটার কথায় তেমন কিছুই নেই। কিন্তু এর খুনে সুরটা আমায় বারবার মারে। পুরো শেষ করে দেয়। মনে বাজতে থাকে , “ তুই আমারে মনে রাখলি না।!'গান না গাইতে পারার দুঃখ আমার কোনদিন যাবে না। গলার কাছে কষ্টের মত গানটা আটকে থাকে। বেরয় না। শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পরে বিষের মত। সুমন ঠিকই বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার, গান আর বন্ধুতা। অন্য কিছু নয়।